তেল নিয়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শত বছরের চুক্তি, ক্ষুব্ধ বহু মানুষ
ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানির সঙ্গে ১০০ বছরের চুক্তি করেছে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার। তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। ক্ষুব্ধ ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল ও সমাজতন্ত্রীদের একটি অংশও। বিবিসি এ খবর প্রকাশ করেছে।
বুধবার রাজধানী কারাকাসে চুক্তিটি সই হয়। এর আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য কাজ করার অধিকার পাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানি। এসব তেলক্ষেত্রে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এই পরিমাণ দেশটির প্রমাণিত তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এটিকে ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।
তবে চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস। তিনি বলেন, রদ্রিগেজ দেশের জাতীয় সম্পদের প্রায় ২০ শতাংশ ‘বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন’। তার মতে, ওয়াশিংটনের চাপের কারণেই এমন শর্তে চুক্তি করা হয়েছে।
চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনেজুয়েলার বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে কাজ করবে। শেভরনের পর এটি দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল উৎপাদক।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। নাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ভেটো ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকিপূর্ণ পথগুলো থেকে পশ্চিম গোলার্ধে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বর্তমান দুরবস্থার কারণে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো কঠিন। ট্রাম্প বলেছেন, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই চুক্তিটি লাভ দিতে শুরু করবে। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকোর মতে, প্রায় ৩০ বছর আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলার আট বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
চুক্তি নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে দেলসি রদ্রিগেজের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। রদ্রিগেজ ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্দো হাউসম্যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ভেনেজুয়েলাকে মুক্ত করার পরিবর্তে দেশটির ‘নিপীড়কদের’ সঙ্গে জোট গঠনে ব্যবহার করা হয়েছে।
দেশটিতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় বিরোধীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বদলে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ে চুক্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসইউভি চুক্তিটিকে সমর্থন করলেও অনেক ভেনেজুয়েলীয় সমাজতন্ত্রী এর বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরোধিতা করার পর এখন দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সেই যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান ও সাবেক তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেজ বলেন, এই চুক্তি ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উপনিবেশবাদের দরজা খুলে দিচ্ছে’।
চুক্তিটি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের পুরোনো বক্তব্যও সামনে এনেছে। ২০০৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেল কোম্পানির সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার পর বলেছিলেন, দেশের তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ আর কখনো হাতছাড়া করা হবে না।
কিন্তু প্রায় দুই দশক পর শাভেজের রাজনৈতিক উত্তরসূরির নেতৃত্বাধীন সরকারই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি তেল চুক্তি করেছে। আর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে দেশের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে।
সূত্র: বিবিসি