দেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর থাকবে না’: রাষ্ট্রপতি
Tags: banglanews, banglanews24, todaynews, trendingnews, updatenews, vairalnews, vairalnews24, viralnews, viralnews24
বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর থাকবে না’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।
“আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।”
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী মতের বহু মানুষকে তুলে নিয়ে বিচার বহির্ভূতভাবে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখার অভিযোগ ওঠে, সেইসব বন্দিশালার প্রতীকী নাম রাখা হয়েছে ‘আয়নাঘর’।
তুলে নেওয়া সেসব মানুষদের কেউ কেউ বহু দিন পর পরিবারের কাছে ফিরে বীভৎস নির্যাতনের বিবরণ দিলেও অনেকের খোঁজ এখনও মেলেনি। বিভিন্ন বাহিনীর আওতাধীন এমন ‘আয়নাঘরের’ সন্ধান পাওয়ার কথা বলেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ‘গুম তদন্ত কমিশন’।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘গুমের’ ঘটনা তদন্তে ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।
প্রতিটি গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধীরা ক্ষমতাবান হলেও দেশে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে জোর দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদের সেই অন্ধকার অধ্যায় আমরা চিরতরে বন্ধ করব।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব গুমের শিকার এই পরিবারগুলোর আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, আরও করবে।”
সম্মিলিতভাবে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। সুশাসন হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি। জবাবদিহিতা ও বাক স্বাধীনতা হবে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফ হবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।
গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ যেন সত্য, ন্যায়, মানবাধিকার ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যায়, সে প্রত্যাশার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের আর্তি তুলে ধরেন এবং গুমে জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
গুমের শিকার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি তীব্র বেদনা নিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে, স্মরণ করছি সেইসব মা-বাবা-ভাই-বোনদের যারা দিনের পর দিন, বছর পর বছর অপেক্ষা করছেন এই বুঝি তাদের সন্তান তাদের স্বজন ফিরে এল।
“স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি সেই সন্তানকে যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে ফিরে আসেননি।”
গুমের নির্মম শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার স্বজন ও সহযোগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জানিয়ে তিনি বলেন, “গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রুহের চির শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করছি।”
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক সামাজিক স্বস্তি। এটা জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ব্যক্তির স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চয়তা দিয়েছে।
“গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সব কটিকে একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।”
‘দেশের বুকে চেপে বসেছিল গুমের দুঃসহ থাবা’
রাষ্ট্রপতি বলেন, “দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরের দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত পোষণ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখন আন্দোলন করেছেন তখনই তাদের জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে হয়েছে।
“অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবাহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।”
এ সময় তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামসহ অগণিত মানুষের কথা স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আইনজীবী ব্যারিস্টার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল আযমীসহ বিভিন্ন মতালম্বী কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধু ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিমুহূর্ত ছিল তাদের মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।”
অনুষ্ঠানমঞ্চে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের ঘট্না তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। এদেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
তিনি বলেন, “আমি অবশ্যই উল্লেখ করতে চাই যে আমাদের একটি মেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে, নির্বিকতার সঙ্গে সেদিন এই গুম হওয়া পরিবারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিল। সে হচ্ছে আমাদের এখন সংসদ সদস্য সানজীদা ইসলাম তুলি… সে নিজে একা লড়ে গেছে। এমনকি সে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনে পর্যন্ত গিয়েছে। সেজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই অভিবাদন জানাই।”
‘ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল’
রাষ্ট্রপতি বলেন, “গণতন্ত্র সাম্যবাদ স্বাধীনতা মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক যে রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
“এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক অপমানজনক অধ্যায়।”
এ সময় প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম খুনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম-খুন, অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ‘ফ্যাসিবাদী’ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তর জনগণ, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, “নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদের বশংবদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।”
‘দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে’
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের প্রকৃত আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
“আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে।”
‘ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না’
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, আইনের নামে মানধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।
“রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ।”
শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নয়নের সাফল্য পরিমাণ করা যায় না, এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিক কতটা নিরাপদ অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করে, সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নচিত্র তুলে ধরে।
“আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, গুমের শিকার সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান, সানজীদা ইসলাম তুলি, তাহসিনা রুশদীর লুনা, আনিসুর রহমান তালুকদার, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ।