ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ হতে পারে এআই-নির্ভর উৎপাদনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল

বাংলাদেশ সরকার ১৩টি মহানগরীর ৫০ হাজারের বেশি বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।

প্রকল্পটি ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলার কথা। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট তৈরি ও ডেটা প্রসেসিংয়ের মতো কাজের কথা বলা হয়েছে।

উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাঁচ বছর মেয়াদি এমন একটি প্রকল্প শুরুর আগে একটি প্রশ্ন করা জরুরি। আমরা কি তরুণদের সেই ফ্রিল্যান্সিং বাজারের জন্য প্রস্তুত করছি, যেটি গত দশকে সুযোগ তৈরি করেছে? নাকি সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর অর্থনীতির জন্য, যেখানে তারা আগামী কয়েক বছরে কাজ করবে?

ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের একটি নতুন পথ তৈরি করেছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে একজন তরুণ দেশ না ছেড়েই বিদেশে সেবা রফতানি করতে পারেন। এ সুযোগ এআইয়ের কারণে শেষ হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। কিন্তু কোন ধরনের কাজের জন্য মানুষকে অর্থ দিতে হবে, সেটি দ্রুত বদলাচ্ছে।

সাধারণ কনটেন্ট তৈরি, প্রাথমিক গ্রাফিক ডিজাইন, নিয়মিত ডেটা প্রসেসিং কিংবা সহজ কিছু ওয়েবভিত্তিক কাজ এখন এআইয়ের সাহায্যে অনেক দ্রুত করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি চারজন কর্মীর একজন এমন কোনো পেশায় রয়েছেন যেখানে জেনারেটিভ এআইয়ের কিছু প্রভাব পড়তে পারে। তবে তাদের মূল বক্তব্য হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশের জন্য পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নত দেশগুলোয় এআই নিয়ে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে একটি প্রশ্ন: এআই কত মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে? বাংলাদেশের মতো দেশে হয়তো আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত: এআই ব্যবহার করে একই কর্মী কত বেশি কাজ করতে পারবেন?

চলতি বছরের বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ চাকরি জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে উচ্চ মাত্রার অটোমেশন ঝুঁকিতে রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশে এ হার প্রায় ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশে প্রায় ১৬ শতাংশ চাকরিতে এআই উল্লেখযোগ্য উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের বড় সম্ভাবনা হয়তো মানুষকে সরিয়ে দেয়া নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো।

আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে সমস্যা কেবল কর্মসংস্থানের অভাব নয়। সমস্যা হলো, সীমিত জনবল দিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ সামলাতে হয়। সরকারি অফিসে এখনো অনেক নথি, আবেদন, চিঠি ও প্রতিবেদন হাতে বা প্রচলিত সফটওয়্যারে ধীরগতিতে প্রক্রিয়াকরণ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজের চাপ রয়েছে। ছোট ব্যবসার পক্ষে হিসাব, বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা বা নিয়মকানুন বোঝার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ রাখা সম্ভব হয় না। এআই এখানে উৎপাদনশীলতার বড় সহায়ক হতে পারে।

একজন কর্মকর্তা যদি নথি খোঁজা, নিয়মিত চিঠির খসড়া তৈরি, দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা কিংবা তথ্য সাজানোর কাজ কয়েক ঘণ্টার বদলে কয়েক মিনিটে করতে পারেন, তার অর্থ এই নয় যে তার চাকরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেল। বরং তিনি একই সময়ে আরো বেশি আবেদন, সেবা বা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবেন।

এর প্রভাব ওই অফিসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি ব্যবসার অনুমোদন দ্রুত হলে ব্যবসাটি আগে কার্যক্রম শুরু করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়লে শিক্ষা ও গবেষণার কাজ দ্রুত হতে পারে। ছোট ব্যবসায়ী রুটিন কাজে সময় কমিয়ে নতুন গ্রাহক ও বাজার খোঁজায় সময় দিতে পারেন। এই অর্থে সরকারি ও বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা নিজেই এক ধরনের অর্থনৈতিক অবকাঠামো। তবে এটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা জরুরি। শুধু বিদেশী এআই প্লাটফর্মে প্রবেশাধিকার দিলেই হবে না। এআই এবং টোকেনভিত্তিক অর্থনীতি যে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে নিজস্ব নিরাপদ এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর অর্থ নতুন করে চ্যাটজিপিটি ধরনের একটি অত্যাধুনিক মডেল তৈরির চেষ্টা নয়। বর্তমানে বিভিন্ন শক্তিশালী ওপেন সোর্স মডেল রয়েছে। বাংলাদেশ সেখান থেকে উপযোগী মডেল বেছে নিয়ে বাংলা ভাষা, স্থানীয় প্রশাসনিক পরিভাষা, আইন, নীতিমালা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোকে অভিযোজিত করতে পারে।

এ ধরনের মডেল দেশের নিজস্ব বা নিয়ন্ত্রিত ডেটা সেন্টারে চালানো গেলে সরকারি নথি, গবেষণা তথ্য কিংবা সংবেদনশীল প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সব সময় বিদেশী বাণিজ্যিক সার্ভারে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। বিদেশী টোকেন বা এআই সেবা ব্যবহারের জন্য নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও লেনদেনের নিরাপত্তা বিদেশী অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তুললে তথ্য নিরাপত্তা, জবাবদিহি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব–সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এখানেই ৬৮৩ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পটির আরো বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রশিক্ষণের একটি স্তরে তরুণদের এআই ব্যবহার করে লেখা, গবেষণা, অনুবাদ, স্প্রেডশিট, বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকসেবা শেখানো যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারেও তাদের প্রতিযোগিতা বাড়বে। আরেকটি স্তরে নির্বাচিত তরুণদের এআই-ভিত্তিক ওয়ার্কফ্লো, ডেটা প্রস্তুতি, অটোমেশন এবং প্রতিষ্ঠানের কাজে এআই যুক্ত করার প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে কাজ করে কোথায় এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা বাস্তবে দেখাতে পারেন।

আরো অগ্রসর একটি অংশ সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক সেবা, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা কিংবা ই-কমার্সের মতো নির্দিষ্ট খাতে এআই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কেউ ফ্রিল্যান্সার হবেন, কেউ পরামর্শক কিংবা উদ্যোক্তা হবেন। তাহলে লক্ষ্যটি শুধু ৫০ হাজার নতুন ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা থাকবে না। লক্ষ্য হতে পারে ৫০ হাজার তরুণকে বাংলাদেশের এআই গ্রহণের চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।

অবশ্য এআই কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। একটি আবেদনপত্র বা নথি যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ১০টি ধাপ অতিক্রম করে, এআই দিয়ে চিঠি দ্রুত লিখলেও পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত হবে না। তাই এআই ব্যবহারের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন, তথ্য ব্যবস্থা এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তার জনমিতিক সুবিধা নিয়ে আলোচনা করছে। এআই হয়তো এর সঙ্গে আরেকটি সুযোগ যোগ করতে পারে, একটি উৎপাদনশীলতার সুবিধা, যেখানে একই মানুষ আরো বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য তৈরি করতে পারবেন।

তাই ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের বিনিয়োগ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে লক্ষ্যটি যেন শুধু আরো ৫১ হাজার মানুষকে ছোট ছোট অনলাইন চুক্তির জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়া না হয়। বিনিয়োগ থাকুক। বদলাক আমরা কী শেখাচ্ছি। লক্ষ্য শুধু তরুণদের গতকালের ফ্রিল্যান্সিং বাজারের জন্য তৈরি করা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের আগামী দিনের এআই-নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতা দেয়া।

ড. মো. হক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ (যুক্তরাজ্য)

ড. আশরাফ দেওয়ান: শিক্ষক, কার্টিন ইউনিভার্সিটি (অস্ট্রেলিয়া)