সন্তানের সকালের নাস্তায় কী রাখবেন? সহজেই তৈরি করুন স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস

Tags: , , , ,

সন্তানকে নাস্তা করানো নিয়ে অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—‘সকালে তাহলে কী খাওয়াব?’

নাস্তা মানেই প্রতিদিন পরোটা, ডিম আর সবজি—এমন কোনো নিয়ম নেই। শিশুর বয়স ও ব্যক্তিগত খাদ্যচাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয় করা যায়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন খাবার বেছে নেওয়া, যা শিশুকে পুষ্টি দেয়, খেতে ভালো লাগে এবং পরিবারের জন্য সহজে প্রস্তুত করা সম্ভব।

ডিম হতে পারে সহজ একটি বিকল্প
ডিম অনেক পরিবারের সকালের নাস্তায় সহজ ও জনপ্রিয় খাবার। সেদ্ধ ডিম, অমলেট বা সবজি মিশিয়ে ডিম—বিভিন্নভাবে পরিবেশন করা যায়।
শিশু যদি ডিম একেবারেই পছন্দ না করে, তাহলে জোর না করে অন্য পুষ্টিকর খাবার দিয়ে তার খাদ্যতালিকা পূরণ করার চেষ্টা করুন।

ফলকে নাস্তায় জায়গা দিন
কলা, আপেল, কমলা, পেয়ারা, পেঁপে বা মৌসুমি ফল—শিশুর উপযোগী ফল নাস্তায় রাখা যেতে পারে। ফলকে আকর্ষণীয় করতে ছোট টুকরো করে দিতে পারেন। দইয়ের সঙ্গে ফল মিশিয়েও পরিবেশন করা যায়। তবে ফলের বদলে প্রতিদিন ফলের জুস দেওয়া ভালো বিকল্প নয়। সম্পূর্ণ ফলেই সাধারণত বেশি ফাইবার থাকে।

দুধ ও দই
শিশু দুধ সহ্য করতে পারলে দুধ বা দই নাস্তায় রাখা যেতে পারে। দইয়ের সঙ্গে ফল বা ওটস যোগ করেও একটি সহজ নাস্তা তৈরি করা সম্ভব। তবে অতিরিক্ত চিনি মেশানো ফ্লেভারড দই বা মিষ্টি পানীয়কে প্রতিদিনের নাস্তার প্রধান অংশ না করাই ভালো।

ওটস, চিড়া ও সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার
ওটস বা চিড়া দুধ/দই ও ফলের সঙ্গে পরিবেশন করা যায়। রুটি বা অন্যান্য সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারও নাস্তায় রাখা যেতে পারে। এতে খাবারে বৈচিত্র্য আসে এবং শিশুর পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন combination তৈরি করা সম্ভব হয়।

সবজি লুকিয়ে নয়, পরিচয় করিয়ে দিন
অনেক অভিভাবক শিশুকে সবজি খাওয়াতে খাবারের মধ্যে সবজি ‘লুকিয়ে’ দেন। এতে কখনো কাজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিশুকে সবজির সঙ্গে পরিচিত করানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অমলেট, স্যান্ডউইচ বা রুটির সঙ্গে অল্প অল্প করে বিভিন্ন সবজি দিতে পারেন। শুরুতে না খেলেও হতাশ হবেন না। নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচিত হতে শিশুর একাধিকবার চেষ্টা লাগতে পারে।

স্কুলে যাওয়ার আগে সময় কম?
সকালে সময়ের অভাবে নাস্তা বাদ পড়া খুবই সাধারণ সমস্যা। তাই আগের রাতেই কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন। ফল ধুয়ে রাখা, স্যান্ডউইচের উপকরণ প্রস্তুত রাখা বা শিশুর নাস্তার পরিকল্পনা আগে করে রাখলে সকালের ব্যস্ততা কমে। তবে ‘দ্রুত খাওয়াতে হবে’ বলে খাবারের সামনে শিশুকে তাড়াহুড়ো করানো ঠিক নয়।

নাস্তাকে পুরস্কার বানাবেন না
‘সবজি খেলে চকোলেট দেব’—এভাবে খাবারকে পুরস্কার বানানোর অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। এতে শিশু স্বাস্থ্যকর খাবারকে অপছন্দের এবং মিষ্টি বা জাঙ্ক ফুডকে পুরস্কারের খাবার হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে।

বরং স্বাস্থ্যকর খাবারকে স্বাভাবিক ও আনন্দদায়ক অভ্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুন। সপ্তাহের নাস্তার পরিকল্পনা করুন। একই খাবার প্রতিদিন না দিয়ে সপ্তাহজুড়ে খাবারে বৈচিত্র্য আনতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে—
একদিন: ডিম + রুটি + ফল
অন্যদিন: দই + ওটস + ফল
আরেকদিন: সবজি অমলেট + রুটি
অন্যদিন: চিড়া + দই + ফল

এগুলো শুধু উদাহরণ। শিশুর বয়স, অ্যালার্জি, পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করতে হবে।

‘এক কামড়’ নিয়মও কাজে লাগতে পারে
শিশু নতুন খাবার দেখেই ‘আমি খাব না’ বললে পুরো খাবার শেষ করার চাপ না দিয়ে অল্প পরিমাণ চেখে দেখতে উৎসাহিত করতে পারেন। তবে এটি যেন জোরজবরদস্তিতে পরিণত না হয়। নতুন খাবার পছন্দ করতে সময় লাগতে পারে।

কখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন?
শিশু মাঝে মাঝে নাস্তা না করলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাবারের প্রতি অনীহা থাকলে বিষয়টি নজরে রাখা দরকার। বিশেষ করে শিশুর ওজন বা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে, খুব সীমিত কিছু খাবার ছাড়া অন্য কিছু না খেলে, খেতে বা গিলতে সমস্যা হলে, বারবার পেটের সমস্যা হলে কিংবা খাবারের কারণে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সন্তানকে নাস্তা খাওয়ানো মানে প্রতিদিন প্লেট পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া নয়। আসল লক্ষ্য হলো শিশুর মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা। আজ শিশু কম খেল, কাল একটু বেশি খেল—এটা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে পুরো সপ্তাহের খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিন। খাবারে বৈচিত্র্য আনুন, শিশুকে কিছুটা সিদ্ধান্ত নিতে দিন, খাবারের সময় স্ক্রিন কমান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—খাবার নিয়ে পরিবারে যেন আতঙ্ক বা যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি না হয়। কারণ ছোটবেলার খাবারের অভ্যাসই ভবিষ্যতের জীবনযাত্রার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।